তারাবির নামাজ কত রাকাত সহীহ হাদিস ও দালিলিক আলোচনা | Taraweeh Prayer Rakats
তারাবির নামাজ কত রাকাত সহীহ হাদিস ও দালিলিক আলোচনা
রমজান মাসের বরকতময় রাতগুলোতে এশার নামাজের পর যে বিশেষ নফল বা সুন্নাত নামাজ আদায় করা হয়, তাকে 'সালাতুত তারাবিহ' বা তারাবির নামাজ বলা হয়। তারাবি শব্দের অর্থ হলো 'বিশ্রাম নেওয়া'। যেহেতু প্রতি চার রাকাত পরপর বিশ্রাম নেওয়া হয়, তাই এর নাম তারাবি।
আমাদের সমাজে তারাবির রাকাত সংখ্যা নিয়ে দুটি প্রধান মত প্রচলিত আছে—৮ রাকাত এবং ২০ রাকাত। আজকের নিবন্ধে আমরা তারাবির নামাজ কত রাকাত সহীহ হাদিস ও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে তা বিশ্লেষণ করব।
১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আমল ও ৮ রাকাতের দলিল
যারা ৮ রাকাত তারাবির কথা বলেন, তারা মূলত সহীহ বুখারীর একটি হাদিসকে প্রধান দলিল হিসেবে পেশ করেন।
হাদিস: হযরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রমজানে রাসূল (সা.)-এর নামাজ কেমন ছিল? তিনি উত্তর দিলেন, "রাসূল (সা.) রমজানে বা রমজানের বাইরে ১১ রাকাতের বেশি (বিতরসহ) পড়তেন না।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২০হিজরী/১১৪৭)
এই হাদিসের ভিত্তিতে অনেক আলেম মনে করেন, তারাবির মূল সুন্নত হলো ৮ রাকাত।
২. সাহাবায়ে কেরাম ও ২০ রাকাতের দলিল
মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ মসজিদে এবং মক্কা-মদিনার হারামাইনে দীর্ঘকাল ধরে ২০ রাকাত তারাবি পড়ার প্রচলন রয়েছে। এর স্বপক্ষেও শক্তিশালী দলিল রয়েছে:
হযরত ওমর (রা.)-এর আমল: হযরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে যখন সাহাবায়ে কেরামকে এক ইমামের পেছনে একত্রিত করা হয়, তখন তারা ২০ রাকাত তারাবি পড়তেন।
হযরত আলী (রা.)-এর আমল: বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত আলী (রা.)-ও ২০ রাকাত তারাবি পড়ার নির্দেশ দিতেন এবং নিজে ইমামতি করতেন।
ইজমা (ঐক্যমত): চার মাজহাবের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফিঈ, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল) ২০ রাকাত তারাবির পক্ষে মত দিয়েছেন।
৩. ৮ নাকি ২০: কোনটি সহীহ?
আসলে ইসলামে নফল বা সুন্নাত নামাজের রাকাত সংখ্যার ক্ষেত্রে প্রশস্ততা রয়েছে। রাসূল (সা.) রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ বা তারাবি) সম্পর্কে বলেছেন—"রাতের নামাজ দুই দুই রাকাত করে।" এখানে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হয়নি।
মানসিক প্রশান্তি: যারা দীর্ঘ সময় নিয়ে ধীরস্থিরে তিলাওয়াত শুনতে চান, তারা ৮ রাকাত পড়তে পারেন।
ঐতিহ্য ও সওয়াব: যারা সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং অধিক সওয়াব আশা করেন, তারা ২০ রাকাত পড়েন।
৫টি গুরুত্বপূর্ণ FAQ (সাধারণ জিজ্ঞাসাসমূহ)
১. তারাবীর নামাজ কি ৮ রাকাত পড়া যাবে?
হ্যাঁ, তারাবির নামাজ ৮ রাকাত পড়া যাবে। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী রাসূল (সা.) বিতরসহ ১১ রাকাত (৮+৩) পড়তেন। কেউ যদি ৮ রাকাত পড়ে তবে তার নামাজ আদায় হয়ে যাবে।
২. মসজিদে নববীতে তারাবি কত রাকাত?
মসজিদে নববী এবং মসজিদে হারামে (মক্কা) ঐতিহাসিকভাবে ২০ রাকাত তারাবি হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করোনা মহামারি এবং অন্যান্য পরিস্থিতির কারণে কখনো কখনো তা কমিয়ে ১০ রাকাত (বিতর ছাড়া) করা হয়েছিল। বর্তমানে সেখানে পূর্ণ ২০ রাকাত বা ১০ রাকাত—উভয় আমলই প্রেক্ষাপট অনুযায়ী দেখা যায়।
৩. ইমাম বুখারী তারাবীহ নামাজ কয় রাকাআত পড়তেন?
বর্ণিত আছে যে, ইমাম বুখারী (রহ.) রমজানের রাতে তাঁর সাথীদের নিয়ে নামাজ পড়তেন এবং প্রতি রাকাতে ২০টি করে আয়াত পাঠ করতেন। তিনি এভাবে ২০ রাকাত পূর্ণ করতেন। (সূত্র: সিয়ারু আলামিন নুবালা)।
৪. তারাবি নামাজ কি চার রাকাত করে পড়া যায়?
তারাবির নামাজ দুই রাকাত করে পড়া সুন্নাহ। তবে কেউ যদি চার রাকাত করে এক সালামে পড়ে, তবে নামাজ হয়ে যাবে, কিন্তু তা সুন্নাহর খেলাফ বা অনুত্তম হবে। হাদিসের নির্দেশ হলো "সালাতুল লাইলি মাছনা মাছনা" অর্থাৎ রাতের নামাজ দুই দুই রাকাত করে।
৫. তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল?
তারাবির নামাজ 'সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ'। অর্থাৎ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত যা রাসূল (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম নিয়মিত আদায় করেছেন। বিনা কারণে এটি ছেড়ে দেওয়া অনুচিত। তবে এটি ফরয বা ওয়াজিব নয়।
৪. তারাবির নামাজের শিক্ষা
রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হলো—আমরা কতটুকু একাগ্রতার সাথে আল্লাহর সামনে দাঁড়াচ্ছি। তারাবি পড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো আল-কোরআন শ্রবণ করা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। ২০ রাকাত তাড়াহুড়ো করে পড়ার চেয়ে ৮ রাকাত ধীরস্থিরে তিলাওয়াত ও রুকু-সিজদাহসহ পড়া উত্তম। আবার কেউ যদি ২০ রাকাতও সুন্দরভাবে পড়তে পারেন, তবে সেটি আরও বেশি সওয়াবের কারণ।
উপসংহার
তারাবির নামাজ কত রাকাত সহীহ হাদিস বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৮ এবং ২০ উভয়ই দালিলিকভবে স্বীকৃত। তাই এটি নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিবাদ করা উচিত নয়। আপনি যেখানে যেভাবে সুযোগ পান, পূর্ণ মনোযোগের সাথে তারাবি আদায় করুন।
